পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে ‘৫ ইঞ্চি’র মোবাইল ফোনে বন্দী — এসে গেছে ওয়েব যুগ

Please follow and like us:
0

(‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে / স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে / ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী / আ হা…ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে / যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে / ঘুচে গেছে বেশ কাল সীমানার গন্ডি / আ হা…’

এই গান যখন গৌতম চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, মোবাইল তো দূরের কথা, আমাদের ঘরে ঘরে টিভি এসে ঢোকেনি। কী অসম্ভব দূরদৃষ্টি নিয়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায় লিখে গেছেন, ‘যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে’ —-। তাঁর এই গানের লাইন মিলিয়েই আমাদের লেখার শিরোনাম, বলা বাহুল্য।)

অজয়বরন দে / অঞ্জন মুখোপাধ্যায়

কাঁধ সামান্য ঝুলে গেছে, ভারী শরীরটা তাই ঈষৎ সামনে ঝোঁকা। গালে সম্পূর্ণ সাদা দাড়ি, গোঁফ। মাথার চুলও বলা বাহুল্য, একেবারে সাদা। নাসিরুদ্দিন শাহকে টেরিফিক মানিয়েছে এই চরিত্রে। নিজের ক্যাফে বন্ধ করার সময়। ভিতরের টেবিলে এক প্রৌঢ়া নারীকে দেখে নাসির সেখানে গিয়ে মুখোমুখি বসে পড়েন। সামান্য পরেই ওই নারী, ভূমিকায় শেহনাজ প্যাটেল আবিষ্কার করেন, তার তি-রি-শ বছর আগের, যৌবনের প্রেমিক  মুখোমুখি বসে।

শর্ট ফিল্ম, মাত্র ৫/৭ মিনিটের এক একটি। ইউ টিউব তথা ওয়েব দুনিয়ায় এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। উপরের সিনেমাটির নাম ‘ইন্টিরিওর ক্যাফে নাইট’। তৈরি হয়েছিল ২০১৪ সালে। বহু পুরস্কারে ভূষিত এই দুর্দান্ত শর্ট ফিল্ম যদি কেউ না দেখে থাকেন এখনও, তবে লোকসান তারই। পরিচালক, মুম্বইএর বাঙালি – অধিরাজ বসু।

আবার স্বয়ং গুগল প্রযোজনা করছে ‘দ্য হিরো – আ বলিউড স্টোরি’র মতো অভিনব গল্প। সংস্থার নাম গুগল, সুতরাং তার প্রযোজনায় শর্টফিল্মও যে ভাল খরচ করে নির্মিত হবে, এতে আর আশ্চর্য কী! একেবারে অখ্যাত বা স্বল্পখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রীরা চমকে দিচ্ছেন এই সব ছোট ছোট শর্ট ফিল্ম গুলিতে। তেমনই দুরন্ত পরিচালনা অজানা বা অল্পচেনা কোনও পরিচালকের।

শর্টফিল্ম মানে এখন আর এলেবেলে – যাহোক করে একটা কিছু নির্মাণ কিন্তু নয়। আর ওয়েব দুনিয়ায় হাউস ফুল বলেও কিছু হয় না। বড় পর্দার যা হাউস ফুল, ওয়েব জগতে তাকে বলে ভিউজ। মানে মোট কত সংখ্যক বার ওই সিনেমাটি দর্শক দেখলেন। শুধু তাই নয়, বড় পর্দার সিনেমা একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর হল থেকে চলে যায়। ওয়েব দুনিয়ায় ফিল্মের অবস্থান কিন্তু অনড়। সু-দীর্ঘ দিন সেটি ইউ টিউবে থেকে যায়।

বড় পর্দার নির্মাণ খরচ, শো, বিজ্ঞাপন – সব মিলিয়ে একেবারে রাজসূয় যজ্ঞ। হিন্দি সিনেমার বাজার গোটা ভারত। সে তুলনায় বাংলা সহ আঞ্চলিক ভাষার সিনেমার একেবারে ত্রাহি দশা এখন। বাজার ক্রমেই সঙ্কুচিত। একদা, মানে মাত্র ২৫ বছর আগেও এ রাজ্যে হলের সংখ্যা ১২০০র বেশি ছিল। মোটামুটি কোনও সিনেমা আট সপ্তাহ চললে তাকে বলা হত হিট সিনেমা। পরে হিটের সংজ্ঞা বদলালেও সিনেমা ব্যবসায় ইনভেস্ট লোকসানের – না, এমন কেউ বলতো না।

খুব ভাল একটা সিনেমা যে চলবেই, তা পরিচালক, প্রযোজক বা নায়ক-নায়িকা – কেউ কোনওদিন বলতে পারে না। ‘চলবেই’ মানে দর্শক দেখবে কী না – এটাকেই লাখ টাকার প্রশ্ন বলা হয়। ওয়েবের ক্ষেত্রে এই ল্যাঠা নেই। ভাল সিনেমা দর্শক আজ না হোক কাল দেখবেই।

আঞ্চলিক ভাষার সিনেমার ক্ষেত্রে দর্শকের এই ‘দেখা-না দেখা’র চয়েস ক্রমেই আরো দূর্বোধ্য হয়ে উঠলো গত ১০ / ১২ বছরে। কারণ হলের সংখ্যা কমতে কমতে – এখন বাংলা সিনেমার জন্য নির্ধারিত হলের সংখ্যা, বিশ্বাস করুন নাই করুন, সারা রাজ্যে কুড়িয়ে বাড়িয়ে, ক্রমে কমে, ৩০০ র নীচে। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্য।

এই অবিশ্বাস্য সত্য ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে বাংলা চলচিত্র শিল্পের। বাংলা সিনেমায় ইনভেস্ট বেশ ঝুঁকির ব্যাপার বলেই গন্য করা হয় এখন।

অথচ, চিরন্তন সত্য এইই যে, চলচিত্র শিল্পের কিন্তু অরন্যদেবের মতো মৃত্যু নেই। মৃত্যু নেই বললে বরং কম বলা হয়। বরং বলা ভাল, চলচিত্র শিল্পের মৃত্যু অসম্ভব। ছায়াছবির মতো এমন দুর্দান্ত গণমাধ্যম মানব সভ্যতার বিনোদনে সেরা। টিভিতে আমরা যা দেখি, তাও আসলে পর্দায় চলমান ছবি। আরও ছোট পর্দা নিয়ে ইউ টিউব বা ওয়েব জগত। অর্থাৎ চলচিত্র শিল্প ছিল, আছে, থাকবে। বদলে যাচ্ছে এবং আরো যাবে এর চিত্রায়িত করার মাধ্যম।

মানুষের এখন আর আগের মতো নির্দিষ্ট সময় মেনে হলমুখো হওয়ার মতো সময় নেই। নেই মানে সত্যিই নেই। অথচ মনের মধ্যে চলচিত্রের চাহিদা আছে। সিনেমা হল মরে গেছে তো কী হয়েছে। মানুষের চাহিদা কিন্তু এক ছটাকও কমেনি।

চাহিদা কমেনি বলেই মানুষ খুঁজে নিচ্ছে ওয়েব মাধ্যমকে। এই খুঁজে নেওয়াকে জল-হাওয়া দিচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। মোবাইলে কোনও ভিক্ষুক ভিক্ষে চাইছে – না, এখনও এমন অ্যাড হ্যান্ডসেট ওয়ালারা বানায়নি বটে, তবে মোবাইল ও হোয়াটস অ্যাপ এবং জুকেরবার্গ সাহেবের দুনিয়া নড়িয়ে দেওয়া ফেসবুক আবিষ্কার মানুষকে অনেক বেশি চলচিত্রপ্রেমী করে তুলেছে নিঃসন্দেহে। ধরণ ধাঁচা বদলে গেছে বড়জোর। ফেসবুকে কত অজস্র সত্যি ও ফেক মুভি হরদম লোড হচ্ছে। প্রতি মুহুর্তে সেখানে আছড়ে পড়ছে নানা টিকাটিপ্পনি।

সবই কিন্তু মুভি। অর্থাৎ মুভির মুভমেন্ট মোটেই থামেনি। থামবেও না। বরং ওয়েব জগতে ব্যবসার জায়গা হলের জটিল হিসেব নিকেষের থেকে অনেক স্বচ্ছ। এই স্বচ্ছতাও কিন্তু নির্মাতাদের কাছে বড় শক্তি। ৫ ইঞ্চির মোবাইল পর্দার বিশ্বজয় অবধারিত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও মানুষের চিরকালীন সৃজনী শক্তির মেলবন্ধনে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *