‘আমার এলাকা’র রাজনীতি আর নেই – দার্জিলিং দেখালো

অঞ্জন মুখোপাধ্যায়ঃ

হই হই করে বামফ্রন্ট জিতে চলেছে। কিন্তু শিয়ালদায় ‘ছোড়দার’ এলাকায় সিপিম তথা বামফ্রন্ট নেই। বামফ্রন্টের অশ্বমেধ ঘোড়া ছুটে চলেছে রাজ্য জুড়ে, কিন্তু বহরমপুরে এসে আটকে যাচ্ছে অধীর চৌধুরীর ‘দূর্গে’। সাংবাদিকেরা এমন দূর্গই লিখে এসেছে ‘আমার এলাকা’ গুলিকে। শুধু বিপক্ষের দূর্গ নয়, নিজেদের দূর্গও ছিল। যেমন ছিল সুভাষ চক্রবর্তীর দূর্গ। তপন সিকদার দমদমে জিতে যাওয়ার পর জ্যোতি বসু পরের ভোটে বেশ আবদারও করেছিলেন প্রিয় শিষ্যের কাছে – ওই আসনটি তার চাই। সুভাষের দূর্গ না?।!

মেদিনীপুরে ছিল সুশান্ত ঘোষের দূর্গ। উত্তর ২৪ পরগনায় তড়িৎ তোপদারের দূর্গ। বরকত গনি খান যখন বেঁচে ছিলেন, তখন মালদা ছিল তার ‘আমার এলাকা’ তথা তার দূর্গ। সমতলে এমন দূর্গ যদি থাকতে পারে পাহাড়ে থাকবে না কেন?

সুতরাং সুভাষ ঘিষিং এক দুর্দান্ত দূর্গ বানিয়ে ফেললেন দার্জিলিং-এ। বাম ফ্রন্ট তথা সিপিএম তাদের বি-শা-ল জমায়েত থেকে হুঁশিয়ারি দিত ঘিষিংকে। বাংলা ভাগ হতে দেব না। তবে জ্যোতি বসু কিংবা বুদ্ধদেব বাবু তাদের মুখ্যমন্ত্রীত্বে কখনও যাননি দার্জিলিং। সুভাষ ঘিষিং জানতেন, বামেদের সে ক্ষমতা নেই। বামেদের দূর্গ রক্ষা করতেন শিলিগুড়িতে বসে অশোক ভট্টাচার্য।

ঘিষিং-এর মতো সৌভাগ্য বিমল গুরুং-এর ততদিন ছিল, যতদিন বামফ্রন্ট ছিল। গুরুং ‘আমার এলাকা’ দার্জিলিং-এর দখল নিয়েছিলেন ঘিসিং কে সরিয়ে। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্যের রাজনীতিতে যে কটি লক্ষনীয় বদল হয়েছে, তার একটি হলো, আমার এলাকার পুনর্বিন্যাস !

তৃণমূলের অনেক নেতা মন্ত্রীর এখনও এমন ভ্রম আছে যে, এটা আমার দূর্গ বা আমার এলাকা। বুদ্ধিমানেরা শুধু এই সাবধানতা মেনে চলে যে, এখানে দিদির দৃষ্টি যেন না পড়ে।

বিমল গুরুং গত বছর ঠিক এমন সময়ে ‘আমার এলাকা’ ভেবে দার্জিলিং-এ রাজনীতি করছিলেন। কিন্তু মমতা আবারো আরও একবার দার্জিলিং গেলেন। এবং আবার গেলেন। আগে গোনা হতো বাম জমানার পর একজন মুখ্যমন্ত্রী শৈল শহরে কবার এলেন, তা নিয়ে। এখন আর কেউ হিসেব রাখে না। বারংবার মুখ্যমন্ত্রীর সফরের জন্য আলাদা করে মঞ্চ বেঁধে হুঙ্কার দিতে হয় না, বাংলা ভাগ হতে দেব না। বাংলা ভাগ নিয়ে নীচু রাজনীতিও করতে হয় না। দার্জিলিং এখন কারো দূর্গ নয়। এ রাজ্যে দূর্গের রাজনীতি আপাতত নেই। এমনকি অনুব্রত মন্ডলের বীরভূমও যে তার দূর্গ নয়, তা কেষ্টবাবু সম্ভবত জানেন।

দল হিসেবে সিপিএম  প্রবল আগ্রাসী হয়ে প্রায় সর্বজ্ঞ হয়ে উঠেছিল এবং নিশ্চিত পতনের পর আরও নিশ্চিত ভাবে রাজ্য রাজনীতিতে নিজেদের অপাংক্তেও করে তুলতে পেরেছে – তার কারণ দূর্গের পতন একবারই হয়। নতুন কিছু নয়, দেশ বিদেশের ইতিহাস দেখলেই হবে।